এনামুল হক রাশেদী,চট্টগ্রাম:
চট্টগ্রামের লোহাগাড়া থেকে মক্কা: গৌরবের এক অনন্য যাত্রায় পবিত্র কাবার গিলাফে ক্যালিওগ্রাফের সোনালী ছোঁয়া চট্টগ্রামের মোখতারের হাতের।
পবিত্র কাবা শরিফের কালো গিলাফ বা ‘কিসওয়া’ বিশ্ব মুসলিমের কাছে শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও আধ্যাত্মিক সৌন্দর্যের এক অনন্য প্রতীক। প্রতিবছর হজ ও ওমরাহ পালন করতে যাওয়া কোটি মুসল্লি কাবা শরিফ তাওয়াফের সময় গিলাফে সোনালি ও রুপালি সুতোয় খচিত পবিত্র কোরআনের আয়াত ও নান্দনিক আরবি ক্যালিগ্রাফি গভীর মুগ্ধতায় অবলোকন করেন। আর এই শিল্পকর্মের পেছনের অন্যতম প্রধান রূপকার বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত, চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার কৃতি সন্তান মুখতার আলম সিকদার।
দীর্ঘ দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি সৌদি আরবের মক্কায় অবস্থিত কিসওয়া তৈরির কারখানায় প্রধান ক্যালিগ্রাফার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ইসলামী ক্যালিগ্রাফি শিল্পে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ সম্প্রতি তাকে সৌদি আরবের নাগরিকত্ব প্রদান করা হয়েছে, যা বাংলাদেশি হিসেবে বিরল এক সম্মান।
জানা যায়, মুখতার আলম সিকদারের পারিবারিক শিকড় চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলায়। ছোটবেলা থেকেই শিল্পচর্চা ও আরবি ক্যালিগ্রাফির প্রতি তার গভীর আগ্রহ ছিল। উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি সৌদি আরবে পাড়ি জমান এবং মক্কার বিখ্যাত উম্মুল কুরা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। ১৯৯২ সালে চারুকলা বিষয়ে স্নাতক এবং ২০০১ সালে আরবি ক্যালিগ্রাফিতে বিশেষায়িত স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। পরবর্তীতে তিনি একই বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি গবেষণায় যুক্ত হন।
শিক্ষাজীবন শেষে ১৯৯৫ থেকে ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত উম্মুল কুরা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা শিক্ষা বিভাগে ক্যালিগ্রাফির শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তার শিল্পকর্ম ও ক্যালিগ্রাফির দক্ষতা দ্রুতই সৌদি আরবের শিল্প ও ধর্মীয় মহলে পরিচিতি লাভ করে।
১৪২২ হিজরি সালে জেদ্দার বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ও ক্যালিগ্রাফার মুহাম্মদ সালেম বাজনাইদের সঙ্গে মুখতার আলমের পরিচয় হয়। তার অসাধারণ ক্যালিগ্রাফি দেখে মুগ্ধ হয়ে বাজনাইদ কিসওয়া কর্তৃপক্ষের কাছে মুখতার আলমের জীবনবৃত্তান্ত ও কাজের নমুনা পাঠান। পরে উম্মুল কুরা বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়োজিত একটি বিশেষ পরীক্ষায় কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হয়ে তিনি ১৪২৩ হিজরির জমাদিউল আউয়াল মাসে (জুলাই ২০০২) কাবা শরিফের গিলাফ তৈরির কারখানায় ক্যালিগ্রাফার হিসেবে নিয়োগ লাভ করেন।
বর্তমানে তিনি মক্কার কিং আবদুল আজিজ কমপ্লেক্স ফর দ্য হোলি কাবা কিসওয়া-এ প্রধান ক্যালিগ্রাফার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। কাবার গিলাফে ব্যবহৃত পবিত্র কোরআনের আয়াত, তাওহিদ, দোয়া ও অন্যান্য আরবি লেখার নকশা, বিন্যাস এবং ক্যালিগ্রাফিক রূপায়ণের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব তার তত্ত্বাবধানে সম্পন্ন হয়।
কাবার গিলাফ তৈরির প্রক্রিয়া অত্যন্ত জটিল ও ব্যয়বহুল। প্রতি বছর প্রায় ৬৭০ কেজি প্রাকৃতিক রেশম, ১২০ কেজির বেশি স্বর্ণের সুতা এবং প্রায় ১০০ কেজি রুপার সুতা ব্যবহার করে নতুন কিসওয়া তৈরি করা হয়। গিলাফের ওপর সূচিকর্মের মাধ্যমে কোরআনের আয়াত ও ইসলামী বাণী খচিত করা হয়, যার নকশা ও ক্যালিগ্রাফি প্রস্তুতে বিশেষজ্ঞ শিল্পীদের দীর্ঘ সময় শ্রম দিতে হয়।
ইতিহাস ঘেঁটে দেখা যায়, কাবার গিলাফের ক্যালিগ্রাফিতে অন্যতম কিংবদন্তি নাম ছিলেন আব্দুর রহিম আমিন বুখারি। তিনি প্রায় ৩০ বছর ধরে কিসওয়ার নকশা ও ক্যালিগ্রাফির দায়িত্ব পালন করেন। তার উত্তরসূরি হিসেবে মুখতার আলম সিকদার এ ঐতিহ্যকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছেন।
চট্টগ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে উঠে এসে ইসলামের সর্বাধিক পবিত্র স্থাপনার গিলাফে পবিত্র কোরআনের আয়াত অঙ্কনের মতো সম্মানজনক দায়িত্ব পালন করে মুখতার আলম সিকদার আজ বিশ্ব মুসলিম সমাজে বাংলাদেশের মুখ উজ্জ্বল করেছেন। তার এই অসাধারণ সাফল্য শুধু চট্টগ্রামবাসীর নয়, সমগ্র বাংলাদেশের জন্য গৌরবের বিষয় হয়ে উঠেছে।
প্রিন্ট করুন
ফটো কার্ড
এ জাতীয় আরো খবর..